গল্প

গল্প

দশ ফুট বাই বারো ফুটের একটি রুম। আসবাবপত্রের খুব একটা বাহুল্য নেই। মেঝেতে শক্ত জাজিমের বিছানার উপর ব্যবহৃত জামাকাপড়ের স্তূপ জমে আছে। দেখেই বোঝা যায়, খুব একটা ব্যবহৃত হয় না ওটা। বিছানার পাশে জানালা মুখী ইজি চেয়ারটার উপরও এলোমেলো ভাবে একটা তোয়ালে পড়ে আছে। জানালার পাশ ঘেঁষে দুটো টেবিল। একটার উপর থেকে বই উপচে পড়ছে। নানা বিষয়ের উপর নানান আকৃতির বই। খুঁজলে হয়তো দুই একটা একাডেমিক বইও পাওয়া যাবে। পাশের টেবিলের চেহারা অবশ্য সম্পূর্ণ বিপরীত। চকচকে মসৃণ তলের উপর কেবল একটা ল্যাপটপ আর একটা কফির মগ। ল্যাপটপের লিডটা আপাতত বন্ধ। খোলার থাকলে বহুল ব্যবহারে নড়বড়ে কিগুলো চোখে পরত। মগের তলায় এখনও কিছুটা কফি অবশিষ্ট আছে। দেখে মনে হয়, পানকারী কোন কারনে কফি শেষ না করেই উঠে পড়েছে। অবশ্য এক অর্থে তাই ঘটেছে। টেবিলের দু পাশে মুখোমুখি দুটি চেয়ার। একজন নিঃসঙ্গ লেখক কেন সব সময় তার সামনে একটি খালি চেয়ার রাখবে সেটা খানিকটা রহস্যপূর্ণও বটে। তবে চেয়ারটা সব সময় যে খালি থাকে তাও না। যেমন আজ সকালেও দুটো চেয়ারই মানুষের শরীরের উত্তাপ পেয়েছে। কফির মগ সামনে নিয়ে এখনও একটা মানুষ চেয়ারে বসে আছে। ডান হাতটা স্থিরভাবে ঝুলছে। শরীরটাও হালকা ডানে হেলে পড়েছে। আচ্ছা মানুষ না বলে দেহ বললে কি যথার্থ হবে; কিংবা লাশ? প্রাণহীন মানুষকে তো লাশই বলে? দেহ বা লাশটা আর কারো নয় আমার নিজেরই।

সকালে যখন ফাহিয়া বিনা নোটিশে এসে হাজির হল বেশ অবাকই হয়ে ছিলাম। বরাবরের মত এসেই রুমের অবস্থা দেখে বাড়ি মাথায় তোলার উপক্রম করল। অনেক চেষ্টা পর গতরাতে লেখা গল্পটা সবার আগে পড়ার দাবি আদায়ের মাধ্যমে শান্ত হয়। আসলে লেখা পড়তে দিতে কোন সমস্যা নেই আমার। ওর এই সবার আগে পড়ার আবদার আর খুন-টুসিগুলো বেশ উপভোগ করি। তাই একটু ছলনার আশ্রয় নেওয়া। আসলেই অনেক ভালোবাসি এই পাগলিটাকে। ওর সাথে আমার পরিচয় ফেসবুকে। আমার লেখার একনিষ্ঠ পাঠক ছিল। সেখান থেকে কমেন্ট চালাচালি, তারপর ইনবক্স, শেষ পর্যন্ত একেবারে হৃদয়ের মাঝে পৌঁছে গেছে কিভাবে যেন। এক বছর পেরোতে চলল। হয়তো আরও অনেক দূর এগতো সম্পর্কটা। যাই হোক, আরও কিছুক্ষণ খুন-টুসি চালিয়ে ফাহিয়া আমার শেষ লেখাটা পড়তে শুরু করল। কয়েক লাইন পড়েই তার মনে হল, কফি ছাড়া এই গল্প জমবে না। যেই ভাবা সেই কাজ। চলে গেল কফি বানাতে। কফিখোর হিসেবে কফির পানি সবসময় গরম করাই থাকে আমার কিচেনে। কিছুক্ষণের মধ্যে দু কাপ ধোয়া ওড়া কফি নিয়ে হাজির হল ফাহিয়া। তখনও বুঝি নি কি হতে চলেছে।
প্রথমে কয়েক চুমুক দিলেও গল্পে ঢুকে যাওয়ার পর হাতের মগ ভর্তি কফির কথা যেন ভুলেই গেছে ফাহিয়া। ওদিকে আমি নিশ্চিন্তে বড় বড় চুমুকে গলাধঃকরণ করে চলছি প্রিয়া হাতে বানানো সকালের প্রথম কাপ কফি। দেখলাম ও গল্পের প্রায় শেষের দিকে চলে এসেছে। তাই মনে মনে প্রশংসা পর্বের জন্য প্রস্তুত হলাম। লেখা যেমনই হোক, প্রতিবার নতুন গল্প পড়া শেষে টানা কয়েক মিনিট লেখকের প্রশংসা না করলে যেন ওর পড়া অসম্পূর্ণ রয়ে যায়। এবারও তাই হল। তবে আমার হাতের খালি মগের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণের জন্য বিরতি টানল। ছুটে গিয়ে মগ ভরে কফি নিয়ে এসে আবার শুরু করল। নিশ্চয়ই ফ্লাস্ক ভর্তি করে বানিয়েছে। যাতে আমার আবার বানানো না লাগে। প্রতিবারই এমন করে। স্তুতি পাঠ শেষে নিজের মগের অবশিষ্ট তেতো কফিটুকু এক চুমুকে শেষ করে ফেলল। এর কিছুক্ষণ পর হঠাৎ করেই চলে যায় ফাহিয়া। শরীর নাকি ভালো লাগছিল না। অবশ্য যাওয়া আগে নিজের কফির মগটা ভালো করে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে রেখে গেছে। যাতে আমার কষ্ট করা না লাগে। ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ? নাকি অন্য কিছু?

ফাহিয়া চলে যাওয়ার ঘন্টাখানেক পর। সামনে ল্যাপটপ নিয়ে নিজের চেয়ারে বসে আছি। বমি বমি ভাবটা কেটে গেছে। মাথার ভেতরটা ঝিম ধরে আছে। অনবরত ঘাম ঝরছে শরীর থেকে। স্নায়ুগুলো শিথিল হয়ে আসছে। ফুসফুসে বারবার বাতাস টেনে নেওয়ার পরও শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি টের পাচ্ছি। বুঝলাম আর খুব বেশি দেরি নেই। আচ্ছা ফাহিয়ার কি অবস্থা? অ্যাকোনাইট ভয়ঙ্কর বিষ। খালি হাতের স্পর্শেও বিষক্রিয়ায় মৃত্যু হতে পারে। নির্দিষ্ট মাত্রার উপরে শরীরে প্রবেশ করলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হার্ট প্যারালাইসিস হয়ে মৃত্যু হয়। ফাহিয়ার কফিতে যে পরিমাণে মিশিয়ে ছিলাম তাতে এতক্ষণে সব শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। তবে আমারটাতে খানিকটা কম দিয়েছিলাম। কারন আমি চেয়েছিলাম মৃত্যুকে উপভোগ করতে, মৃত্যুর স্বাদের প্রতিটি ফোঁটা চেখে দেখতে। ফাহিয়া ক্ষেত্রে বিষয়টা দ্রুত করতে চেয়েছিলাম। কষ্ট কম পাক মেয়েটা। বেচারির তো খুব একটা দোষ নেই। কেবল কিছু দিন ধরে সিয়ামের সাথে একটু বেশিই ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠে ছিল। আমার মৃত্যুর পর বাল্য বন্ধুত্ব যে অন্য কোন দিকে মোড় নেবে না তার নিশ্চয়তা কি? ফাহিয়া শুধুই আমার। ছিল আর এখন থাকবেও।

একাই মরার পরিকল্পনা ছিল আমার। সে অনুযায়ী এই নেপালি বিষ নাবি বা অ্যাকোনাইটও যোগার করেছিলাম। শেষ হয়ে গিয়েছিলাম আমি। অনেক চেষ্টা করেও একটা লাইন আসত না মাথায়। আর আত্মহত্যার অনুভূতিটা ঠিক কেমন তা জানারও ইচ্ছে অনেক দিনের। গল্পে অনেককে দিয়েই আত্মহত্যা করিয়েছি কিনা। তাই সিদ্ধান্তটা নিয়েই নিয়েছিলাম। আজ ফাহিয়া হুট করে এসে পড়ে সব তালগোল পাকিয়ে দিল। ফাহিয়া যখন মনোযোগ দিয়ে গল্পটা পড়ছিল তখন হঠাৎ মাথায় আসে, আমি চলে যাওয়ার পর ফাহিয়ার কি হবে? আর ঐ সিয়ামটা তো আছেই। পরিকল্পনায় সামান্য পরিবর্তন আনি। ফাহিয়াকেও সাথে করে নিয়ে যাব আমি। দ্বিতীয়বার কফি আনতে গেলে ওর মগে বিষ মিশাই। আর ফাহিয়া চলে যাওয়ার পর আমার মগে।

কিছুক্ষণ আগে মৃত্যু দূত এসে দেহ থেকে আত্মা বের করে দিয়ে গেছে আমার। পায়ে ভারি শেকল বাধা অবস্থায় রুমের এক কোণে পরে আছি। শাস্তির ফেরেশতাদের পদ ধ্বনি শুনতে পাচ্ছি এখান থেকেই। আত্মহত্যা ও মানব হত্যার দায়ে দায়ী এক পাপিষ্ঠ আত্মাকে শাস্তির গহ্বরে নিক্ষেপ করার জন্য আসছে ওরা।

অনির্বাণ
রাত ৩ টা ৪৩ মিনিট
২১ জুলাই ২০১৪

এক নিশ্বাসে গল্পটা পড়া শেষ করে আমার দিকে ফিরে হুঙ্কার ছাড়ল ফাহিয়া। “কুত্তা এগুলা কি লিখছিস? আর তোরে না মানা করছি গল্পে আমার নাম দিবি না? শালা নিজে মরছে সেই সাথে আমারেও খুন করছে। আবার পাপিষ্ঠ আত্মা, শাস্তির ফেরেশতা!!!” “আত্মহত্যা আর মানুষ খুন করলে আত্মা পাপিষ্ঠ হবে না তো কি হবে? আর দুনিয়াতে ফাহিয়া তুই একাই আছিস? গল্পের ফাহিয়ার সাথে লেখকের ফেসবুকে পরিচয়। আর তুই আমার সাথে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িস।” বলে মুখে অমায়িক একটা হাসি টানলাম আমি। জানি এ হাসিতে ফাহিয়া কপুকাত হবেই। হলও তাই। খানিকটা নরম হয়ে কৌতূহল ভরা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “সত্যিই ভালবাসিস তোর গল্পের এই ফাহিয়াকে?” আমি মুচকি হেসে খালি মগ দেখিয়ে বললাম, “আগে কফি নিয়ে আয় তারপর বলব।” “কেন সত্যি সত্যি বিষ মেশাবি নাকি?” হেসে দিয়ে ফাহিয়া বলল। “ভালোবাসার মানুষকে কেউ খুন করে না” আমার উত্তর। উত্তর শুনে লজ্জায় লাল হয়ে যাওয়া মুখ লুকাতে ফাহিয়া ছুটে গেল কিচেনে। কফি আনতে।

গল্পটা লিখতে সত্যিই অনেক কষ্ট হয়েছে আমার। অনেক দিন ধরেই লিখতে পারছি না। চেয়েছিলাম সব কিছু গল্পের মত করতে। কিন্তু সবটা হল না। ফাহিয়া ঝগড়া শেষে আমার রুম গুছিয়ে গল্প পড়তে বসেছিল। এটা গল্পে বাদ পরে গেছে। নাহ, আমি আসলেই লিখতে পারছি না। এই সহজ জিনিসটা আমার দৃষ্টি এড়িয়ে গেল কিভাবে? আর হ্যাঁ, কফিটা ফাহিয়া না, আমি বানিয়েছি। আচ্ছা এখনও কিছু হচ্ছে না কেন? আর কত সময় লাগবে? বিষে আবার ভেজাল ছিল না তো? অ্যাকোনাইট তো এতক্ষণে কাজ শুরু করে দেওয়ার কথা।।

প্রথম প্রকাশ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *